আন্তর্জাতিক

ইরান মার্কিন সম্ভাব্য আসন্ন যুদ্ধ পরিস্থিতির হিসাব নিকাশ।

ইরান মার্কিন সম্ভাব্য আসন্ন যুদ্ধ পরিস্থিতির হিসাব নিকাশ

“আত্মরক্ষার নামে মার্কিন সরকার ইরানের চারপাশে সামরিক সমাবেশ ঘটিয়ে যেভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে তা আমার কাছে ফাঁকা আওয়াজ মনে হচ্ছে। আমি মনে করিনা মার্কিনিরা এত সহজে ইরান আক্রমণ করবে। আমার ধারনার সপক্ষে কয়েকটি পয়েন্ট তুলে ধরা হল।”

১। ইরানের ভৌগলিক অবস্থান সামরিক আক্রমণের জন্য সহজ টার্গেট নয়। ১৬ লক্ষ ৮৪ হাজার বর্গমাইলের দেশটির বেশিরভাগ অঞ্চল পাহাড়ঘেরা। গ্রাউন্ড এটাক করতে হলে পাকিস্থান, আফগানিস্থান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, আরমেনিয়া বা ইরাক থেকে ইরানে প্রবেশ করতে হবে। দুর্গম পাহাড় বেষ্টিত পাকিস্থান বা আফগান বর্ডার দিয়ে ইরানে প্রবেশ সামরিক কৌশল বিবেচনায় বেশ কঠিন।

২। বেল্ট এন্ড রৌড় ইনেশিয়েটিভের কারণে পাকিস্থান ও আফগানিস্থান চীনের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ন। বিশেষ করে গাওয়াদের সমুদ্র বন্দর চীনের বেল্ট এন্ড রৌড় প্রোজেক্টের গুরুত্বপূর্ন পয়েন্ট। এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক তৎপরতা চীন সহজে মেনে নেবে না।

ইরান মার্কিন সম্ভাব্য আসন্ন যুদ্ধ পরিস্থিতির হিসাব নিকাশ

৩। তুর্কেমেনিস্থান, আজারবাইজান, বা আরমেনিয়া বর্ডারে মার্কিন সামরিক ঘাটি নেই। এই অঞ্চলে নতুন মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রাশিয়া মেনে নেবে না। অতএব এই অঞ্চল দিয়ে গ্রাউন্ড এটাক আপাতত সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না।

৪ ইরাকে ইরানের কৌশলগত অবস্থান বেশ ভালো। ইরাকের বর্তমান সরকারের সাথে ইরানের ভালো বুঝাপড়া রয়েছে। ইসলামিক স্টেইটের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে ইরাক ইরানের সামরিক সহায়তা নিয়েছে। ইরাকে মার্কিন উপস্থিতিতে এ সাহায্য বেশ তাৎপর্যপূর্ন। ডিফেন্স মিনিস্ট্রি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ‘প্রতিবেশী দেশে আক্রমণ চালাতে কাউকে ইরাকের মাটি ব্যবহার করতে দেয়া হবে না’। দীর্ঘদিন ধরে ইরান ইরাকী শিয়া মিলিশিয়াদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য করে আসছে। ধারণা করা যায় ইরানে আক্রমণ হলে শিয়া মিলিশিয়ারা ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের উপর চড়াও হবে। অতএব, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ইরাক থেকে ইরানে আক্রমণ বেশ কঠিন।

৫। গালফ কান্ট্রিজ ( কুয়েইত, সৌদি আরব, বাহরেইন, কাতার, ইউনাইটেড আরব এমিরেটস) থেকে ইরানে আক্রমণ পরিচালনা করা বেশ ব্যায়বহুল। এই অঞ্চলের সামরিক বেইজ থেকে মার্কিনিরা বিমান হামলা ও ইন্টারন্যশনাল ওয়াটারস (পারসিয়ান গলফ ও গলফ অফ ওমান) থেকে যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে মিসাইল এটাক করতে সক্ষম। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে সাগর থেকে ইরানে আক্রমণ খুব একটা কার্যকর হবে না। কারণ গত কয়েক দশকে ইরানের মিসাইল সক্ষমতা বেড়েছে কয়েকগুন। গলফ অঞ্চল থেকে বিমান হামলা বা যুদ্ধজাহাজ থেকে মিসাইল হামলা হলে ইরান বেশ ভালোভাবেই তা প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

৬। গলফ অঞ্চলের হরমুজ প্রণালী পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন মেরিটাইম চেকপয়েন্ট। এই পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কার্গোশিপ ও অয়েল ট্যাংকার (১৪ টি অয়েলও ট্যাংকার আনুমানিক ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল ক্রুড অয়েল বহন করে যা গ্লোবাল অয়েল ট্রেডের ২০%) চলাচল করে। ইরানের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা দিয়ে ২১ মাইল প্রস্থের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না।

৭। হরমুজ প্রণালী যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে বিশ্ব বাজারে জ্বালানীর দাম বাড়ার সম্ভবনা প্রবল। জ্বালানীর দাম বাড়লে আনসেটেলড ফাইনান্সিয়াল মার্কেট আরেকবার উলট পালট হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। তাছাড়া জ্বালানীর দাম বাড়লে রাশিয়া মন্দা কাটিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। মার্কিনিরা নিশ্চই চাইবেনা দীর্ঘদিনের শত্রু রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠুক।

৮। ইরানে আক্রমণ হলে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতিরা ইসরাইল ও সৌদি আরবে আক্রমণ চালাবে বলে ধারনা করা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে সিরিয়া, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনের মিলিশিয়ারা যদি পুরো মিডল ইস্টে আক্রমণ শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কি?

৯। বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইরান এখন বেশ গুরুত্বপূর্ন শক্তি। মার্কিন বিরোধী অনানুষ্ঠানিক জোট চীন- রাশিয়া ইরানকে বিশ্বস্ত মিত্র মনে করে। ইরানের উপর আক্রমণ হলে চীন ও রাশিয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইরানের পক্ষে দাঁড়াবে। যেমনটি হয়েছে সিরিয়া ও ভেনেজুয়েলায়। প্রশ্ন হচ্ছে সিরিয়া ও ভেনিজুয়েলার অসমাপ্ত মিশনের সাথে ইরানের মতো বিশাল মিশন শুরু করার জন্য মার্কিনিরা কতটুকু প্রস্তুত? যদি প্রস্তুত থাকে তাহলে লার্জ স্কেলের যুদ্ধ চালানোর জন্য মিত্রশক্তিরা একমত কিনা?

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে ইরাকের মতো একটি সহজলভ্য যুদ্ধলক্ষ্য মনে করে, তাতে তাদের মৌলিক ও ঐতিহাসিক ভুল হবে। ইরান আক্রমণ করলে মার্কিন ও তার সম্ভাব্য মিত্ররা একটা দীর্ঘস্থায়ী ও কঠিন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, যা সম্ভবতঃ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ লাভ করবে।”

Leave a Comment